'হ্যাঁ' ভোট 'না' ভোট কী? জেনে নিন।
গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট দিলে কী পাবেন আর 'না' ভোট দিলে কী পাবেন না, জেনে নিন।
ভোট দেবো, নাকি দেবো না এই প্রশ্নটা অনেকের মাথায় ঘোরে, বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে। কেউ ভাবে আমার একটা ভোটে কীই বা হবে, আবার কেউ মনে করে ভোট দেওয়াই নাগরিক দায়িত্ব। এই দ্বিধা নতুন কিছু নয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই প্রশ্নের গুরুত্ব অনেক গভীর।
আজ আমরা সহজ ভাষায় বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব ভোট কী, কেন দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কেউ কেন ভোট দিতে চায় না, আর ভোট না দিলে আসলে কী প্রভাব পড়ে।
ভোট আসলে কী?
ভোট হলো নাগরিকের মত প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার। একটি দেশের মানুষ ভোটের মাধ্যমে ঠিক করে কে তাদের হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। সংসদ সদস্য, মেয়র, কাউন্সিলর বা স্থানীয় প্রতিনিধিএরা কেউই নিজেরা ক্ষমতায় আসে না, জনগণের ভোটেই আসে।
অর্থাৎ ভোট শুধু একটা বোতামে চাপ দেওয়া নয়। এটা হলো নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের এলাকার উন্নয়ন, নিজের অধিকারসবকিছুর ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অংশগ্রহণ।
গণতন্ত্রে ভোট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণ। আর সেই শক্তির প্রকাশ ঘটে ভোটের মাধ্যমে। ভোট না থাকলে জনগণের মতামতের কোনো মূল্য থাকত না। তখন শাসনব্যবস্থা হতো একপাক্ষিক।
ভোটের মাধ্যমে
- সরকার পরিবর্তন করা যায়
- দুর্নীতিবাজ নেতৃত্বকে সরানো যায়
- ভালো কাজ করা নেতাকে আবার সুযোগ দেওয়া যায়
অর্থাৎ ভোট হচ্ছে জনগণের হাতে থাকা সবচেয়ে বড় শান্তিপূর্ণ শক্তি।
আমার এক ভোটে কী হবে এই ভাবনা কতটা ঠিক?
অনেকেই ভাবে, লাখ লাখ ভোটের মধ্যে আমার এক ভোটের কী দাম? কিন্তু বাস্তবে অনেক নির্বাচনে খুব অল্প ব্যবধানে ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। একটি আসনে কখনও ১০০ ভোট, কখনও ৫০ ভোটের ব্যবধানেও প্রার্থী জিতেছে বা হেরেছে।
ভাবুন, যদি সেই ৫০ জন মানুষও আমার ভোটে কী হবে ভেবে ভোট না দিত, তাহলে ফলাফল পুরো উল্টো হয়ে যেতে পারত। একটা ভোট একা কিছু না মনে হলেও, অনেক “একটা” মিলেই ফলাফল বদলে দেয়।
ভোট দেওয়া নাগরিক দায়িত্ব কেন?
আমরা যেমন রাস্তা ব্যবহার করি, বিদ্যুৎ চাই, নিরাপত্তা চাই, শিক্ষা ও চিকিৎসা চাই এগুলো সবই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর রাষ্ট্র কে চালাবে, সেটা ঠিক করার দায়িত্ব নাগরিকের। ভোট না দিয়ে আমরা আসলে বলি
যে-ই আসুক, আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সবারই যায় আসে। কারণ সিদ্ধান্তগুলো প্রভাব ফেলে :
- আমাদের চাকরি
- দ্রব্যমূল্য
- শিক্ষাব্যবস্থা
- আইন-শৃঙ্খলা
- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন
তাহলে মানুষ ভোট দিতে চায় না কেন?
এটারও কিছু বাস্তব কারণ আছে। সবাই যে দায়িত্বজ্ঞানহীন, তা নয়।
১. রাজনীতির ওপর আস্থা কম
অনেকে মনে করে সব দলই একই রকম, কেউ ক্ষমতায় গিয়ে ভালো কাজ করে না। তাই তারা ভাবে ভোট দিয়ে লাভ নেই।
২. পছন্দের প্রার্থী নেই
কখনও এমন হয়, কোনো প্রার্থীই যোগ্য মনে হয় না। তখন ভোটার দ্বিধায় পড়ে।
৩. ঝামেলা এড়াতে চায়
কিছু মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ঝামেলা, ভিড়, গরম, সময় নষ্ট এসব ভেবে আর যায় না। রাজনীতি অপছন্দ, অনেকে রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চায়। তারা ভাবে, রাজনীতি নোংরা জিনিস, তাই এতে জড়াবে না। এই কারণগুলো বোঝা যায়, কিন্তু সমাধান কি ভোট না দেওয়া?
ভোট না দিলে আসলে কী হয়?
আপনি ভোট না দিলে নির্বাচন কিন্তু থেমে থাকে না। অন্যরা ভোট দেয়, ফলাফল হয়, সরকার গঠিত হয়।তাহলে আপনার না দেওয়া ভোটের মানে দাঁড়ায় আপনি নিজের সিদ্ধান্তের অধিকার অন্যের হাতে তুলে দিলেন। ধরুন, আপনার এলাকায় একজন খারাপ প্রার্থী জিতে গেল। পরে রাস্তা হলো না, দুর্নীতি বাড়ল, সমস্যা বাড়ল। তখন প্রতিবাদ করার নৈতিক শক্তি অনেকটাই কমে যায়, যদি আপনি ভোটই না দিয়ে থাকেন।
ভোট দেওয়া মানে কি শুধু দলকে সমর্থন করা?
না। ভোট দেওয়া মানে সবসময় অন্ধ সমর্থন না। বরং এটা হচ্ছে তুলনা করে কম খারাপ বা বেশি ভালো বিকল্প বেছে নেওয়া।গণতন্ত্রে নিখুঁত প্রার্থী খুব কমই থাকে। কিন্তু ভোটারদের কাজ হলো
কে তুলনামূলকভাবে
- সৎ
- যোগ্য
- এলাকার জন্য কাজ করতে আগ্রহী
তরুণদের ভোট কেন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ?
একটি দেশের বড় অংশ তরুণ। কিন্তু অনেক সময় তরুণরাই ভোট দিতে আগ্রহ কম দেখায়। অথচ ভবিষ্যতের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে তাদের জীবনেই।এসব সরাসরি তরুণদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। তাই তরুণদের ভোট মানে ভবিষ্যতের জন্য ভোট।
আজ যে নীতি হচ্ছে
- শিক্ষা
- প্রযুক্তি
- কর্মসংস্থান
- স্টার্টআপ সুযোগ
সবাই খারাপ ভাবলে কী করা উচিত?
যদি সত্যিই মনে হয় কেউই যোগ্য না, তবুও ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের মত প্রকাশ করা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশে “না ভোট” বা প্রতিবাদী ভোটের ধারণা আছে। এর মাধ্যমে বোঝানো যায় ভোটাররা সন্তুষ্ট না। ভোট না দেওয়ার চেয়ে অসন্তোষ জানিয়ে ভোট দেওয়া গণতান্ত্রিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী বার্তা।
ভোট কি সত্যিই পরিবর্তন আনে?
ইতিহাস বলছে, আনে।
ভোটের মাধ্যমে
- স্বৈরশাসন শেষ হয়েছে
- দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার হেরেছে
- নেতৃত্ব উঠে এসেছে
হ্যাঁ, সব পরিবর্তন এক দিনে হয় না। কিন্তু ভোট ছাড়া পরিবর্তনের পথ আরও কঠিন, কখনও সহিংসও হয়ে যেতে পারে। ভোট শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের রাস্তা।
পরিবার ও সমাজে ভোটের প্রভাব
আপনি একা ভোট দিলেও তার প্রভাব পরিবারে পড়ে। যখন পরিবারের সবাই সচেতন হয়, তখন একটা সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি হয় আমরা দায়িত্বশীল নাগরিক। অর্থাৎ ভোট কেবল রাজনৈতিক কাজ নয়, এটা নাগরিক সংস্কৃতির অংশ।
এই মানসিকতা থেকে
- আইন মানার প্রবণতা বাড়ে
- সামাজিক দায়িত্ববোধ বাড়ে
- দুর্নীতিকে স্বাভাবিক ভাবা কমে
ভোট কেন উৎসবের মতো হওয়া উচিত?
অনেক দেশে ভোটের দিনটা উৎসবের মতো। মানুষ গর্ব নিয়ে যায়, ছবি তোলে, আঙুলে কালি দেখায়। কারণ তারা জানে আজ তারা দেশের সিদ্ধান্তে অংশ নিচ্ছে। আমাদের মধ্যেও এই মনোভাব তৈরি হওয়া দরকার। ভোট মানে শুধু দায়িত্ব না, এটা অধিকারও। অনেক দেশে মানুষ এই অধিকার পেতেই বহু বছর লড়াই করেছে।
ভুল প্রার্থী জিতলে কি ভোটার দায়ী?
আংশিকভাবে, হ্যাঁ। যদি মানুষ যাচাই না করে, শুধু আবেগে বা গুজবে ভোট দেয়, তাহলে ভুল সিদ্ধান্তের দায়ও কিছুটা ভোটারের। এসব জানার চেষ্টা করা উচিত। সচেতন ভোটারই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
তাই ভোট দেওয়ার আগে
- প্রার্থীর অতীত কাজ
- তার বিরুদ্ধে অভিযোগ
- এলাকার জন্য পরিকল্পনা
ভোট না দেওয়া কি প্রতিবাদ?
অনেকে ভাবে ভোট না দেওয়াই প্রতিবাদ। কিন্তু সমস্যাটা হলো এই প্রতিবাদ চোখে পড়ে না। কেউ জানেই না আপনি কেন ভোট দিলেন না। কিন্তু ভোট দিয়ে সচেতনভাবে মত প্রকাশ করলে সেটা রেকর্ড হয়। ফলাফলে তার প্রভাব পড়ে। তাই নীরব থাকা আর সক্রিয়ভাবে মত দেওয়া এক জিনিস না।
গ্রাম ও শহরে ভোটের গুরুত্ব
গ্রামে ভোটের প্রভাব অনেক সময় সরাসরি চোখে পড়ে রাস্তা, ব্রিজ, স্কুল, হাসপাতাল। শহরেও একই, তবে বড় আকারে যানজট, পরিবহন, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এই সব সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তাই আপনি যেখানেই থাকুন, ভোটের ফলাফল আপনার দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে।
নারীদের ভোট কেন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ?
আগে অনেক সমাজে নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তারা এই অধিকার পেয়েছে। তাই নারীদের ভোট মানে কেবল একজন ভোটার না, এটা সমান অধিকার ও অংশগ্রহণের প্রতীক। নারীরা ভোট দিলে
- নারী স্বাস্থ্য
- নিরাপত্তা
- শিক্ষা
প্রবাসী ও নতুন ভোটারদের ভূমিকা
যারা প্রথমবার ভোট দেয়, তাদের উত্তেজনা আলাদা। নতুন ভোটাররা সাধারণত পরিবর্তন চায়, নতুন চিন্তা আনে। তাদের অংশগ্রহণ রাজনীতিকে তরুণমুখী ও ভবিষ্যৎমুখী করে। প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও ভোট গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। তাদের মতামতও সমান মূল্যবান।
শেষ কথা: ভোট দেবো, নাকি দেবো না?
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভোট না দিলেও রাজনীতি আপনাকে ছাড়ে না।
সরকারের সিদ্ধান্ত আপনার জীবনেই প্রভাব ফেলে। তাই ভোট দেওয়া মানে শুধু নেতা বেছে নেওয়া নয়।এটা নিজের অধিকার রক্ষা করা। নিজের ভবিষ্যতের পক্ষে দাঁড়ানো। এবং বলা দেশের সিদ্ধান্তে আমারও মত আছে। গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি বন্দুক না, ক্ষমতা না ভোট। আর সেই শক্তি আপনার হাতেই।

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url